কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী | Sarat Chandra Chattopadhyay Biography In Bengali

Sarat Chandra Chattopadhyay Biography In Bengali. বাংলা সাহিত্যের জগতে শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় ‘দরদী কথাশিল্পী’ নামে পরিচিত। সাহিত্যের মাধ্যমে শরৎচন্দ্র সহজ ও অনাড়ম্ভর ভাবে এদেশের ঘরোয়া কাহিনী বিবৃত করেছেন। তিনি যেভাবে সাহিত্যের মধ্যে মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-প্রতিহিংসার ছবি এঁকেছেন, তার মধ্যে দিয়ে এই সত্যই সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে শরৎচন্দ্র একজন মানবপ্রেমিক। 

শরৎচন্দ্রের বিভিন্ন উপন্যাসের প্রধান বিষয় হল সাধারণ নরনারীর মর্মকথা। সমাজের চোখে যারা অবজ্ঞাত, সমাজ-শাসনে যারা নিপীড়িত, সেইসব মানুষের মনের কথাকে তিনি তার গল্পের মধ্যে এমন ভাবে প্রকাশ করেছেন যা অতিসহজেই পাঠকের সহানুভূতি আকর্ষণ করে। 

এই পোস্টে আপনি সম্পূর্ণ বিবরণ পাবেন Sarat Chandra Chattopadhyay Biography In Bengali, Sarat Chandra Chattopadhyay Jiboni.

জন্ম: ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর
জন্মের স্থান: হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রাম
পিতার নাম: মোহিতলাল চট্টোপাধ্যায়
মাতার নাম: ভুবনমোহিনী দেবী
শিক্ষা: হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুল
তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুল
স্ত্রী: প্রথম শ্রী – শান্তি দেবী
দ্বিতীয় শ্রী – মোক্ষদা
মৃত্যু: ১৬ জানুয়ারী ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে

Childhood & Early Life –

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর, হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। গ্রামটি হওয়া-বর্ধমান শাখার ব্যান্ডেল স্টেশনের নিকটবর্তী এবং সরস্বতি নদীর ধারে। শরৎচন্দ্রের পিতার নাম মোহিতলাল চট্টোপাধ্যায় এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। কবির লালন পালন হয়েছে তাঁর পরিবারের দারিদ্রতার মধ্যে দিয়েই।

শরৎচন্দ্রের শৈশব কালের বেশিরভাগ সময় বিহারে তাঁর পিতামহ কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে কেটেছে, যেখানে তাঁর বাবা কিছুকাল চাকরি করেছিলেন। শরৎচন্দ্রের পিতা কোন চাকরিতেই বেশিদিন টিঁকতেন না, ফলে তার পরিবারে অর্থকষ্ট থাকতো। 

একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করার কারণে, শরৎচন্দ্র তার নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনেক উপন্যাস রচনা করেছেন। তিনি মানুষের অন্তর্জগতের বিচিত্র রহস্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন তার কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।

Education –

শরৎচন্দ্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পিয়ারী পন্ডিতের পাঠশালা থেকে। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে পড়াশুনা করেন, এবং এরপর তার পরিবার স্থানান্তরিত হয় ভাগলপুরে। সেখানেই ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন। 

১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি Fine Arts অর্থাৎ IA ক্লাসে পড়েন। কিন্তু অবশেষে তার পরিবারের দরিদ্রদের কারণে Fine Arts পড়া ছাড়তে হলো। তাঁর পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরে তিনি নিজেকে বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করতে নিযুক্ত করেছিলেন। তারপর তার পরিবারের দারিদ্রতা তাকে কাজের সন্ধান করতে বাধ্য করেছিল।

Career –

জীবিকার জন্য ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্র চাকরি গ্রহণ করেন বিহারের গোড্ডায় রাজ বনালী এস্টেটে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি এই চাকরি ছেড়ে দেন এবং যোগদান করেন সাঁওতাল পরগনার সেটেলমেন্টর কাজে। শরৎচন্দ্রের জীবনে কোনো স্থিরতা ছিল না, তাই তিনি অভিজ্ঞতা করতে থাকে বিভিন্ন পরিস্থিতি।

১৯০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি জমিদারবাড়ির গায়ক-বাদক হিসেবে কাজ করতেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে, ২৭ বছর বয়সে তিনি বার্মায় চলে যান এবং রাঙ্গুনের একটি সরকারী অফিসে ক্লার্কের কাজ করেন। তারপরে তিনি বার্মা রেলওয়ের অ্যাকাউন্টস বিভাগে একটি স্থায়ী চাকরী অর্জন করেছিলেন। তাছাড়া তিনি আরও নানাস্থানে নানারকম কাজ করেন।  

আরোও পড়ুন: জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যসৃষ্টি ও জীবনী।

শরৎচন্দ্রের প্রথম ছোট গল্প “মন্দির” প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে, এবং পরের বছর এই গল্পের জন্য তিনি কুন্তলীন পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি প্রাইয়ই যমুনা ম্যাগাজিনে তার রচিত গল্প প্রকাশ করতেন। সেই সময়ের স্বাধীনতার আন্দোলনকে ইঙ্গিত করেও তিনি অনেক গল্প রচনা করেছেন। তার লেখা ”পথের দাবী” গল্প বিপ্লব আন্দোলনের চারদিকে ঘেরা। শরৎচন্দ্রের সর্বশেষ উপন্যাস হলো “শেষ প্রশ্ন”, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে। 

রাজনৈতিক, দেশপ্রেমিক প্রভৃতি ক্ষেত্রেও শরৎচন্দ্রের বিচরণ ছিল স্বাভাবিক। চিত্তরঞ্জন দাসের অবদানে তিনি কংগ্রেসে যুগদান দিয়েছিলেন এবং ১৯২১ থেকে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি হাওড়া জেলা শাখার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুর শোকসবাই তিনি সভাপতিত্ব করেন। 

Married Life –

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কবি বিবাহ করেন শান্তি দেবীকে। এই দম্পতি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে। এরপরের বছর শান্তিদেবী ও তাঁর পুত্র প্লেগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন। 

তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর, তিনি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন মেদিনীপুর নিবাসী কৃষ্ণদাস অধিকারীর ১৪ বছরের বাল্যবিধবা কন্যা মোক্ষদাকে। শরৎচন্দ্র তাকে ‘হিরণ্ময়ী’ নামে ডাকতো। 

Novels & Stories –

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর জীবনে অনেক উপন্যাস লিখেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ‘বড়দিদি’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘পন্ডিতমশাই’, ‘অরক্ষণীয়া’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘স্বামী’ প্রভৃতি। এরমধ্যে ‘বড়দিদি’ তার প্রথম উপন্যাস, যা প্রকাশিত হয় ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে।

তাছাড়া তিনি লিখেছেন বাংলার জনপ্রিয় রোমান্টিক উপন্যাস ‘দেবদাস’। এই উপন্যাসটি ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে লেখা হলেও, তার জীবনে কিছু অসুবিধা থাকার কারণে তিনি তা প্রকাশিত করেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে।  

তার লেখা অনেকগুলো উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভারতী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘যমুনা’, ‘নারায়ণ’ প্রভৃতি বাংলার বিখ্যাত পত্রিকাগুলোতে। তার লেখা বিখ্যাত ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে। শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পর তার লেখা ”শেষের পরিচয়” উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে। 

Sarat Chandra Chattopadhyay Biography In Bengali

শরৎচন্দ্রের রচিত অসংখ্য গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গল্পগুলি হলো – ‘রামের সুমতি’, ‘মেজদিদি’, ‘মন্দির’, ‘মহেশ’, ‘অভাগীর’, ‘স্বর্গ’, ‘লালু’ প্রভৃতি। এরমধ্যে ‘মন্দির’ গল্পটি ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ পেয়েছিলেন। তবে গল্পটি সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গুপাধ্যায়ের নামে প্রকাশিত হয়। 

তার লেখা নাটক ‘ষোড়শী’ যা প্রকাশিত হয় ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, ‘রমা’ প্রকাশিত হয় ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এবং ‘বিজয়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। তাছাড়া তিনি আনিলা দেবীর ছদ্মনামে লেখেন ‘নারীর লেখা’, ‘নারীর মূল্য’, ‘কানকাটা’ ও ‘গুরুশিষ্য সংবাদ’। এগুলি প্রকাশিত হয় যমুনা পত্রিকায়। 

শরৎসাহিত্যের একটি বিশেষত্ব হল নারীচরিত্রচিত্রন। বঙ্গনারীর মর্মবেদনা শরৎসাহিত্যের একটি বিশেষ অধ্যায়। নারীর ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে সমাজসত্তার যে সম্পর্ক, তা শরৎচন্দ্রের গল্প ও উপন্যাস গুলির মধ্যে ফুটে উঠে। 

পড়তে পারেন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী।

Awards And Achievements –

  • ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘জগত্তারিণী সুবর্ণপদক’ প্রাপ্ত হন সাহিত্যকীর্তির জন্য। 
  • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘মন্দির’ ১৯০৪ সালে কুন্তলিন পুরস্কার জিতেছিল।
  • ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘বঙ্গীয় সঙ্গীত পরিষদ’ এর সদস্যপদ পেয়েছিলেন।
  • ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক সংবর্ধনা লাভ করেন। 

Some Famous Quotes Of Sarat Chandra –

1. “যিনি আপনাকে ভালবাসেন কেবল তিনিই জানেন যে আপনার আকর্ষণটির শক্তি কতটা শক্ত” – Sarat Chandra Chattopadhyay.

2. “পাপ লুকিয়ে রাখলে আরও বেড়ে যায়। ” – Sarat Chandra Chattopadhyay.

3. “জলের মতো প্রসারিত প্রান্তে, প্রতি মিনিটে উপকূলে এর ক্ষয় চিহ্নিত হয় এবং ধীরে ধীরে চলে যায়। ” – Sarat Chandra Chattopadhyay.

4. “তিনি মহিলাদের হৃদয়ের দুর্বলতা, লজ্জা এবং বিনয়ের জন্য বারবার স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ” – Sarat Chandra Chattopadhyay.

5. “যখন হৃদয় ঘৃণা দ্বারা পূর্ণ হয়,তখন একজন ব্যক্তি তার যা ইচ্ছা করে তা করার অধিকার পান। ” – Sarat Chandra Chattopadhyay.

Death Of Sarat Chandra Chattopadhyay –

শরৎচন্দ্র ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বায়ু পরিবর্তনের জন্য যান দেওঘর। সেখানে ৩ মাস থেকে তিনি ফিরে আসেন। একই বছর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তার পেটে যন্ত্রনা ও পাকাশয়ের পীড়া শুরু হয়। লিভারে ক্যানসার ও পাকস্থলীতে পচন ধরা পরে।

কলকাতার নানা হাসপাতালে তিনি ভর্তি হন চিকিৎসার জন্য। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে অস্ত্রোপচারের জন্য সম্মতি দেন তিনি। অবশেষে, ১৬ জানুয়ারী ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। শরৎচন্দ্র হয়তো বা চলে গেছেন, কিন্তু তার রচিত গল্পগুলো আজও আমাদের মনে তার স্মৃতি রেখেছেন। 


আশা করি আপনি “Sarat Chandra Chattopadhyay Biography In Bengali আর্টিকেলটি পছন্দ করেছেন। যদি আপনার কাছে আর্টিকেল তা ভালো লেগে থাকে তাহলে আপনার Social Media তে Share করোন। Regular Update এর জন্য আমাদের Facebook Page ফলো করোন।

Leave a Comment

0 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap