আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনী | Jagadish Chandra Bose Biography In Bengali

Jagadish Chandra Bose Biography In Bengali. জগদীশ চন্দ্র বসু হল ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, যিনি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে প্রকৃতির মধ্যে প্রাণী ও উদ্ভিদ উভয়ই সমান গুরুত্ব প্রাপ্য। তিনি বিশ্ববিজ্ঞান জগতের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। অরণ্যের অন্তরের বেদনা যাঁর মনে ব্যথার বীজ বুনে দিয়েছিল, গাছেরও প্রাণ আছে – এটা যেই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বারা প্রমান করেছিলেন, তিনি হলেন স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। 

এই পোস্টে আপনি সম্পূর্ণ বিবরণ পাবেন Jagadish Chandra Bose Biography In Bengali, About Jagadish Chandra Bose In Bengali, Jagadish Chandra Bose Jiboni.

জন্ম: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর
জন্মের স্থান: বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ময়মনসিংহ শহরে
পিতার নাম: ভগবানচন্দ্র বসু
মাতার নাম: বামাসুন্দরী দেবী
শিক্ষা: হেয়ার স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়
স্ত্রী: অবলা দাস
মৃত্যু: ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর

Early Life Of Jagadish Chandra Bose –

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর, বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ময়মনসিংহ শহরে জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম হয়েছিল। তাঁর পিতার নাম ভগবানচন্দ্র বসু ও মাতা বামাসুন্দরী দেবী। ভগবানচন্দ্র বসু ডেপুটি কালেক্টরের চাকরি করতেন এবং তিনি ছিলেন অত্যন্ত দেশপ্রেমিক। জগদীশচন্দ্র বাল্যকাল থেকেই ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি ও গৌরবের অনুরাগী ছিলেন। 

জগদীশচন্দ্র বসুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরে, সেখান থেকে বাংলা-স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি চলে আসেন কলকতায়। কলকাতায় এসে তিনি প্রথম ভর্তি হন হেয়ার স্কুলে, এবং পরে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। এখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানে অনার্স সহ তিনি বি এ পাস করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বিলেত যান ডাক্তারি পড়ার জন্য, কিন্তু তার শারীরিক অসুস্থতার কারণের তিনি ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিলেন। তবে বিলেত গিয়ে তিনি আইসিএস পরীক্ষায় সফল হন এবং তারপরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এস সি ডিগ্রী নিয়ে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরে আসেন। 

Married Life Of Jagadish Chandra Bose –

১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে, তিনি ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দূর্গা মোহন দাসের কন্যা অবলা দাসের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

অবলা দাস একজন ভারতীয় সমাজকর্মী ছিলেন। মহিলা শিক্ষায় তার প্রচেষ্টা এবং বিধবাদের সহায়তার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। 

তিনি ১৮৮২ সালে মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে মেডিসিন পড়ার জন্য সরকারী বৃত্তি নিয়ে মাদ্রাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু জগদীশচন্দ্রের মতো শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার এই পড়া ছাড়তে হল। 

পড়তে পারেন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী। 

Work-Life & Researches Of Jagadish Chandra Bose –

জগদীশ চন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয় অধ্যাপক হিসেবে। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে জগদীশচন্দ্র কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞানের অধ্যপকরূপে যোগ দিলেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৩০ বছর অধ্যাপনা করে অবসর গ্রহণ করেন। পরে ওই কলেজেই আমৃত্যু ‘এমেরিটাস প্রফেসর’ পদ অলংকৃত করেন। 

জগদীশচন্দ্র ছিলেন অসাধারণ গবেষক। তিনি অধ্যাপক থাকাকালীন গবেষণায় প্রচন্ড মগ্ন থাকতেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তখন উন্নত ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির অভাব ছিল। জগদীশচন্দ্র দেশীয় কারিগরদের সাহায্যে যন্ত্রপাতি তৈরী করেন, এবং পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। 

Jagadish Chandra Bose Biography In Bengali

বিদ্যুৎ তরঙ্গের উপর মৌলিক গবেষণার জন্য তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি এস সি ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি একটি এমন যন্ত্র তৈরী করেন, যার সাহায্যে তার (Wire) ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সংবাদ পাঠানো যায়। 

তার এই বিস্ময়কর প্রতিভার জন্য ভারত সরকার তাকে বৃত্তি দিয়ে বিদেশে পাঠালেন। লিভারপুলের বিজ্ঞানী সম্মেলনে জগদীশচন্দ্র আলোক তরঙ্গের উপর তার মৌলিক গবেষণা এবং আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করে বিজ্ঞান জগতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উম্মুক্ত করেন। 

ইতিমধ্যে বেতারযন্ত্র (Radio research) আবিষ্কার নিয়ে জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনে ঘটল এক বেদনায়ক অভিজ্ঞতা। তিনিই প্রথম বেতারে সংবাদ প্রেরণের কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। তা তিনি বন্ধু বিজ্ঞানীদের কাছে ব্যক্ত করে ফেললেন। তাঁর দেওয়া এই সূত্র পেয়ে একজন বিজ্ঞানী তাকে পদে পদে বাধা দিতে লাগলো। 

“The true laboratory is the mind, where behind illusions we uncover the laws of truth.” — Jagadish Chandra Bose.

মার্কোনি (Guglielmo Marconi) নামক একজন বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্রের এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব করে নিজের নামে তা পেটেন্ট করে নিলেন। ফলে বেতার আবিষ্কারক হিসেবে জগদীশচন্দ্রের কোনো স্থান রইলো না। 

জগদীশচন্দ্রের জীবনে এই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা তার গবেষণার প্রকৃতি বদলে দিল। পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা ছেড়ে তিনি এবার উদ্ভিদবিজ্ঞানে গবেষণা করতে লাগলেন। জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম বিজ্ঞানী যিনি পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে ‘গাছেরও প্রাণ আছে’।

জগদীশচন্দ্রের এই আবিষ্কার বিজ্ঞানী মহলে দারুণ আলোড়ন জাগালেন। তিনি যে যন্ত্রের দ্বারা এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করেছিলেন তার নাম হল ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’, এবং এই যন্ত্রটি তিনি নিজেই দেশীয় কর্মচারীদের সাহায্যে বানিয়েছেন।  

His Love For Writing –

জগদীশচন্দ্র সাহিত্যিক ছিল না, বিজ্ঞান সাধনাই ছিল তার স্বক্ষেত্র, বিজ্ঞান বিষয়ে তার গবেষণার পাশাপাশি সেইসব বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ রচনাতেও তার বরাবর উৎসাহ ছিল। 

বাংলার বিজ্ঞান বিষয়ে রচনার ক্ষেত্রে জগদীশচন্দ্রের দান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, সাহিত্য, মুকুল প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। পরে সেই প্রবন্ধগুলি ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে সংকলিত হয়।  

অধিকাংশ রচনায় তার বিজ্ঞান-বিষয়ক আবিষ্কার ও পরীক্ষার উপর নির্ভরশীল মৌলিক তত্ত্ব। 

১৮৯৬ সালে, জগদীশচন্দ্র বসু বাংলা বিজ্ঞান কথাসাহিত্যের প্রথম বড় রচনা “নিরুদ্দেশের কাহিনী” প্রকাশিত করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার প্রথম বিজ্ঞান কথাসাহিত্যিক।

Honors Of Jagadish Chandra Bose –

১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে বিশ্ববিজ্ঞান সম্মেলন হয়, জগদীশচন্দ্র সে সম্মেলনে যোগদান করে মৌলিক গবেষণার বিষয় প্রকাশ করে প্রচুর প্রশংসা লাভ করেন। প্যারিস থেকে তিনি গেলেন লন্ডনে, সেখানেও বিজ্ঞানী সমাজ তার প্রতিভার পরিচয় পেয়ে চমৎকার।

আরও পড়ুন: সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী। 

এরপর জগদীশচন্দ্র আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান প্রভৃতি রাষ্ট্রে গিয়ে বিজ্ঞান মহলে গভীর চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। জগদীশচন্দ্র তার আবিষ্কারের বিস্ময়কর প্রতিভার জন্য অনেক পুরস্কার ও সন্মান লাভ করেছেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য :

  • ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে জগদীশচন্দ্র বসু ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত হন।
  • ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তাকে Fellow of the Royal Society হিসেবে Select করা হয়, এবং ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে তাকে President of the 14th session of the Indian Science Congress হিসেবে Select করা হয়।
  • জগদীশচন্দ্র বসুকে League of Nations’ Committee for Intellectual Cooperation এর মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। 

Death Of Jagadish Chandra Bose –

অবশেষে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর, ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার পথিকৃৎ জগদীশচন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়। 

ভারতের বিজ্ঞানসাধনাকে তিনি বিশ্বের দরবারে উচ্চ আসন দান করে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ আধুনিক বিজ্ঞানসাধনার এক পবিত্র প্রতিষ্ঠান। 

জগদীশচন্দ্র বসু হয়তো বা চলে গেছেন, কিন্তু বিজ্ঞান জগতে তার অবদান আমাদের মনে সবসময় তার স্মৃতি রাখবে।


আশা করি আপনি “Jagadish Chandra Bose Biography In Bengali আর্টিকেলটি পছন্দ করেছেন। যদি আপনার কাছে আর্টিকেল তা ভালো লেগে থাকে তাহলে আপনার Social Media তে Share করোন। Regular Update এর জন্য আমাদের Facebook Page ফলো করোন।

Leave a Comment

0 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap